১
সালাম সালাম হাজার সালাম
সকল শহিদ স্মরণে
আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই
তাদের স্মৃতি চরণে
বেজে ওঠে নেওয়াজের ফোনে। গতকাল বড় ভাইয়ার ফোন
থেকে পার করেছে এই গানটি। সাথে সাথে সকালের এলার্মে লাগিয়ে দিয়েছে ঐ গান। বেজে
উঠেছে ঠিক পৌঁনে পাঁচটায়। তাতে জেগে ওঠে নেওয়াজ। ঘুমকাতুরে নেওয়াজ জীবনে প্রথমবার
এত সকালে উঠলো। এলার্ম বন্ধ করার জন্য তাকে বিছানা ছেড়ে উঠতেই হবে। কারণ, মোবাইলটা
আছে বিছানা থেকে খানিকটা দূরে একটা টেবিলে। মোবাইল এখানে রাখার হুকুম দিয়েছেন
স্বয়ং নেওয়াজের বাবা। কেননা এতে দুটো লাভ। একটা হলো, ওখানে থাকলে মোবাইল নেওয়াজের মস্তিষ্কের
কাছ থেকে অনেকটা দূরে থাকবে, যেটা ঘুমের সময় অনেক জরুরী। আর দ্বিতীয়ত, এলার্ম বন্ধ
করার জন্য নেওয়াজকে বিছানা ছাড়তেই হবে, এতে তার ঘুম একটু হলেও ছেড়ে যাবে, আর
দ্বিতীয়বার বিছানায় টান টান হয়ে শুয়ে পড়ার ইচ্ছা জাগবে না।
বিছানা ছেড়ে উঠে দেওয়ালের বড় ঘড়িটার দিকে নজর
দিতেই ঘুম একেবারে হাওয়া হয়ে গেছে নেওয়াজের। ঘড়িতে সময় দেখেই জেগে উঠেছে সন্দেহ! এখন বাজে ঠিক ভোর ৪টা ৪৬ মিনিট। কিন্তু এলার্ম
দেওয়ার কথা সোজাসোজি পাঁচটায়, কেননা মোবাইল আর দেওয়াল ঘড়ির সময় দুটো একেবারে
সেকেন্ডে সেকেন্ডে মিলিয়ে রেখেছে সে। তাহলে হলো কী? তিনটা সমস্যা ঘুরপাক খায়
নেওয়াজের মাথায়। এক- দেওয়াল ঘড়িটার ব্যাটারি ফুড়ুৎ, দুই- তার মোবাইলের সময় ঠিক
নাই, তিন- সে এলার্মের সময় ঠিক করতে ভুল করেছে। যদি ১মটা সত্য হয়, তাহলে কোনো
সমস্যা নেই। কিন্তু যদি পরের দুটো সত্য হয়, তাহলে নিজের ওপর অনেক রাগ হবে তার,
সেদিকে কোনো সন্দেহ নেই।
তবে মোবাইলটা দেখতেই তার সব সন্দেহ কেটে গিয়ে
চলে যাওয়া ঘুম আবার চোখের পাতায় নেমে আসতে চায়। কারণটা সহজ, দেওয়াল ঘড়িও ঠিক আছে,
মোবাইলের ঘড়িও ঠিক আছে, আবার এলার্ম দেওয়ার সময়ও ঠিক আছে। গানটা বেজে উঠেছে, কারণ
বন্ধু ওয়াসিম তাকে ফোন করেছিলো। আর ফোনের রিংটোনেও যে নেওয়াজ একই গান লাগিয়ে
রেখেছে, সেটা তার খেয়াল ছিলো না। ওয়াসিমকে আবার ফোন না করে সে চটপট একটা এসএমএস
পাঠিয়ে দেয়, Ôনাস্তার পরে ক্লাবে আসছি, যা বলার ওখানেই বলিস।Õ এরপর সে হাতমুখ
ধুয়ে পবিত্র হয়ে সকালের অবশ্য কর্তব্যগুলো সেরে ফেলতে শুরু করে।
এদিকে ওয়াসিমের কাছে এসএমএস চলে গেছে। সেটা পড়েই
ওয়াসিম হাসতে থাকে, কারণ সে সফল হয়েছে। নেওয়াজকে কোনো দরকারে সে ফোন দেয়নি, ফোন
দিয়েছিলো তার ঘুম ভাঙানোর জন্য। দেরী করে ওঠা নেওয়াজের অন্যতম অভ্যাস। তার জন্য এই
যে কয়েকদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা হলো, তার একটাতেও সকালে পড়তে বসতে পারেনি সে। রাত
জেগে গোয়েন্দাকাহিনী পড়লে সহজে ঘুম ছাড়ার কথাও না।
পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগের দিনই তাকে নেওয়াজের ঘুম
ভাঙানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন নেওয়াজের মাতা। কিন্তু পরীক্ষা চলাকালীন এই
এক্সপেরিমেন্ট করতে পারেনি। কারণ দায়িত্ব পাওয়ার পরেরদিন কল দিয়ে মোবাইল সুইচ-অফ
পেয়েছে। নেওয়াজের কাছে জানতে পেরেছে পরীক্ষার কয়েকদিন তার কাছে কোনো ফোন থাকবে না।
গতকাল এসএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তাই আজকে এই পরীক্ষাটা করে দেখলো। এবং প্রথমবারেই
সফল।
এসএসসি শেষ। তাই সে পড়াশোনা থেকে অবসর নেবে
কয়েকদিনের জন্য। তারপর আবার শুরু। তবে এই কয়েকদিন বন্ধুদের সাথে ক্লাবে কাটানোটাই
বেশি উপভোগ করবে সে। শুধু সে নয়। নেওয়াজ, মিরাজ আর আমিন, এই তিনজনের বেলাতেই কথাটা
সত্যি।
এদিকে সকাল সকাল জগিংয়ে বেড়িয়ে পড়েছে মিরাজ।
পরীক্ষায় কোনোমতে পাস করলেই হলো, কিন্তু স্বাস্থ্যের দিকে হেলাফেলা করা যাবে না,
এই হলো মিরাজের জীবনের মূলমন্ত্র। পড়াশোনায় মন নেই, মন কেবল নিজের দেহের দিকে।
পড়াশোনা চুলোয় যাক, কিন্তু স্বাস্থ্য যেন না যায়। মিরাজের এরকম চিন্তাভাবনার পেছনে
দায়ী একটা সুন্দর প্রবাদ- Ôস্বাস্থ্যই সম্পদÕ। মিরাজ ধরে নিয়েছে যতদিন
তার স্বাস্থ্য ঠিক, ততদিন সম্পদের কোনো অভাব তার হবে না।
ঐজন্যেই কাকভোরে উঠে দৌড়ায়। সকালে নাস্তায় দুধের
ভেতরে কাঁচা ডিম মিশিয়ে খায়। রুটিন মাফিক খাবার-দাবার সারে। আর জিম তো আছেই।
সেখানে ওয়ার্ক-আউট করে। তাতেও যেন শান্তি হয়নি, বাড়িতেও ছোটখাট জিম বানিয়ে নিয়েছে।
সরঞ্জাম ছাড়া ব্যায়াম করার যাবতীয় কৌশন সে জানে। তাই ব্যায়াম করার জন্য জিম বা
বাড়িতে থাকার প্রয়োজন নেই তার। সেখানে সময় পায়, ব্যায়াম করতে লেগে যায়।
তাতে ফলাফলও মারাত্মক। ক্লাস সিক্সে থাকতেই
দৃশ্যমান করে ফেলেছে সিক্স-প্যাক। এখন চলছে ওগুলোকে শক্ত বানানোর প্রশিক্ষণ। ওর
কাধের মতো চওড়া কাধ ঐ এলাকায় ওর বয়সের আর কারো নেই। ওর বয়সী ছেলেদের পায়ের পেশি,
ওর হাতের পেশির সমান। লম্বায় ৬ ফুট পার। তবে
ওজনে কোনো কম-বেশি নেই। বিএমআই, বিএমআর, সব একেবারে ঠিকঠাক। শোনা যায় ক্লাস এইটে
থাকতে নাকি মার্শাল-আর্ট ট্রেনিং নিয়ে এসেছে।
তবে পড়াশোনায় পিছিয়ে থাকায় ক্লাস সেভেনে পরপর
তিনবার ফেল করেছে। সকলের আশঙ্কা ছিলো, যেন আদুভাইয়ের মতো অবস্থা না হয়ে যায়।
কিন্তু শেষবার যখন নেওয়াজরা তার সহপাঠী হলো, তখন আদুভাইয়ের মতো ভাগ্য আর তার হয়নি।
আমিন নিজে ওকে পড়িয়েছে। আর ওয়াসিম শিখিয়েছে নকল করার নিয়ম, কিন্তু সেটা কাজে
লাগেনি। আর শেষ কাজটা করেছে নেওয়াজ। পরীক্ষার হলে গিয়ে যে যে জায়গায় মিরাজ আটকে
গেছে, সেখানে সেখানে সাহায্য করে দিয়েছে আকারে ইঙ্গিতে।
ক্লাস সেভেনই তার ফেল হওয়ার জায়গা। এরপর আর
হয়নি। তবে ফেল মারার কারণে বয়সে হয়ে গেছে সবার মুরুব্বি। আর সবচেয়ে উন্নত দেহ
তারই। ক্লাসের কাউকে তোয়াক্কা করে না, তবে ক্লাসের জন্য আর ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের
জন্য যেকোনো ঝামেলা মোকাবেলা করতে ও তৈরি। কেউ যদি এসে কেবল একবার অভিযোগ করে যে
মিরাজ ভাইয়া, সিনিয়র ক্লাসের ও বা ঐ এলাকার ও আমাকে মেরেছে, তাহলে আর ঐ ও এর রক্ষা
নেই।
শেষে বাদ থাকলো আমিন। ওর মতো বইয়ের পোকা ওর
পাড়ায় আর কেউ নেই। সবসময় হাতে বই। বেশিরভাগ সময় পাঠ্যবই। বইয়ের প্রতিটা লাইন যেন
ওর নখদর্পনে। কোনো বই থেকে ওকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তাহলে সে শুধু প্রশ্নের উত্তর
দেয় না, তার সাথে সাথে বইয়ের কোন অধ্যায়ের কোন পৃষ্ঠার কত নম্বর পাঠের কত নম্বর
প্যারার কত নম্বর লাইনে উত্তরটি পাওয়া যাবে, সেটাও বলে দিতে পারে অনায়াসে। সবসময়
চোখে উচ্চ পাওয়ারের চশমা। শুধু বই পড়লে এমন হতো না। কিন্তু ও বই না কিনে, বা
লাইব্রেরীতে না গিয়ে, মোবাইলে বইয়ের পিডিএফ পড়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর বাড়ি ও ক্লাব
ছাড়া, ওকে বিশেষ কোথাও যেতে দেখা যায় না। ওর মোবাইলে ডাউনলোড করা অ্যাপ একটাই, আর
সেটা হলো ডব্লিউপিএস অফিস।
আবার যাওয়া যাক নেওয়াজের কাছে। ওর মাথা থেকে যেন
গানটি নামতেই চাচ্ছে না। নাস্তা করে নেয়। হঠাৎ আবার তার ফোন বেজে ওঠে। ফোন ধরার
আগে দেখে নিলো কলারের নামটি। আমিন ফোন করেছে। খানিকক্ষণ কথা হয়। এবার তাকে যেতে
হবে ক্লাবে। সাইকেল নিয়ে সেদিকেই ছোটে নেওয়াজ।
পৌঁছে গিয়ে দেখে ওয়াসিম, আমিন, মিরাজ সবাই ওখানে আছে। ওরা চা পান করছিলো। আমিন
একটা খবরের কাগজে চোখ বুলাচ্ছে। ওয়াসিম নেওয়াজের দিকে একটা চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়। দিয়ে
বলে, Ôদেখ কাণ্ড!! তুই আসতে দেরী করলি, আর চা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো।
আরেকটু আগে আসতে পারলি না?Õ
Ôওসব রাখ। আগে বল, এত জরুরী তলব কেন?Õ
Ôদেখ না, আমিন খবরের কাগজে কী একটা শেঠবাড়ি না কী যেন বের
করেছে। এই আমিন, কী বের করেছিস, নেওয়াজকে একটু দেখা।Õ
আমিন খবরের কাগজটা নিয়ে নেওয়াজের দিকে এগিয়ে
আসে। নেওয়াজের সামনে মেলে ধরে আর নেওয়াজকে খবরটা পড়ে দেখতে বলে। নেওয়াজ পত্রিকা
হাতে নিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে খবরের শিরোনামের দিকে, যেখানে লেখা আছে, শেঠবাড়িতে কঙ্কালের খোঁজ।
পুরো খবরটা পড়ে ফেলে নেওয়াজ। শুরু থেকে শেষ
পর্যন্ত। একবার নয়, দুইবার নয়, ৯ বার দেখা গেছে কঙ্কাল। ৯ জন আলাদা আলাদা মানুষ দেখেছে।
খবরটা শুনেই হয়তো নেওয়াজদের পাড়ার ইনস্পেক্টর শিরোপা খান হার্টফেল করে পড়ে আছেন
হাসপাতালে। নেওয়াজ ভেবে পায় না, এইরকম দয়ার সাগর মানুষটি এত ভীতু কেন।
নেওয়াজ আবার খানিকক্ষণ চোখ বুলিয়ে পুরো খবরটা
পড়ে নেয়। তারপর বলে, Õরাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তো অনেকবার এই বাড়িটা চোখের সামনে
পড়ে। কিন্তু এতবড় বিষয় ঘটে গেছে এটাকে নিয়ে। সত্যিই তাজ্জব ব্যাপার। ইনস্পেক্টর
সাহেব তো হাসপাতালে। পত্রিকার লোকেরা অবশ্য এই ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস। সিরিয়াস না
হলে কেউ ২য় পাতার মতো একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাতায় এই খবর ছাপাতো না। আমিন, এই
পত্রিকা ছাড়া অন্য কোনো পত্রিকায় এই খবর পেয়েছিস?Õ
আমিন মাথা নাড়িয়ে না জবাব দিয়ে দেয়।
নেওয়াজ আবার বলতে শুরু করে, Ôএদিকে পুলিশের
ভয়ের কারণে যে কয়টা সাহসী ছিলো, সবাই লুকিয়ে পড়েছে। আর পাড়ার শিক্ষিত জনসাধারণ বিষয়টাকে যেন
দেখতেই পাচ্ছে না। সবাই বিষয়টাকে উড়িয়ে দিচ্ছে। তবে বাড়ির আশেপাশে যা জঙ্গল, ভেতরে ঢুকতে সমস্যা
হবে।Õ
মিরাজ এতক্ষন নীরবে চায়ের কাপ হাতে পায়চারী করছিলো। এবার সে বলে ওঠে, Ôআর এই নেওয়াজকে লোকে বলে সাহসী! হাহ! আরে তুই যদি সাহসী হতিস না তাহলে...........Õ
Ôদেখ মিরাজ। তোকে একটা কথা বল রাখি। লোকে আমাকে এমনি এমনি সাহসী বলে না। আমি সত্যিই সাহসী বলেই লোকে তা বলে। আর আমি যে একজন সাহসী ছেলে, তা আমি যথাসময়েই প্রমাণ দেবো।Õ
ওয়াসিম বলল, Ôতাহলে মনে হয় নেওয়াজের প্রমাণ দেওয়ার সময় চলে এসেছে।Õ
Ôআর বলতে হবে না। খুব ভালো করে আমি বুঝে গেছি। তার মানে তোরা চাস যেন আমরা এর তদন্ত করতে যাই।Õ
Ôআগে একটা দোটানা ছিল মনে যে যাবো কি যাবো না। এখন তুই বললি, তাই কি আর থামতে পারি। চল শেষ দেখে আসি।Õ
নেওয়াজ বলল, Ôআজকে আর যাব না। কাল ভোর চারটায় সবাই ক্লাবে উপস্থিত হবি, এক সেকেন্ড যেন দেরি না হয়।Õ
সবাই ঠিক আছে বলে যে যার বাড়ি চলে যায়।
২
পরের দিন সবাই ঠিক সময় উপস্থিত হল ক্লাবে। মিরাজ অবশ্য পাঁচ মিনিট দেরি করল।
নেওয়াজ বলল, Ôমিরাজ তুই জাস্ট ৪ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড লেট! তাই রবিবারের দিন তুই আমাদের ফুচকা খাওয়াবি। এটাই তোর শাস্তি।Õ
Ôআচ্ছা নে নে, খাওয়াবো। এবার আর দেরি করা ঠিক হবে না। শেঠ বাড়িতে কেন কঙ্কাল বের হচ্ছে, তার কারণ আজকে খুঁজে বের করতেই হবে।Õ
ওয়াসিম বলল, Ôএই না হলে বয়োজ্যোষ্ঠর মতো কথা!Õ
নেওয়াজ বলল, Ôসবাই তাহলে প্রস্তুত। চল যাওয়া যাক।Õ
অন ইয়োর সাইকেল
রেডি
হ্যান্ডেল স্টেডি,
প্যাডেল........
ওরা পৌঁছে গেলো। সময় লাগলো প্রায় ঘন্টাখানেক। ওরা সবাই ঝোপের আড়ালে ওদের সাইকেলগুলো রাখল। এবার চলতে শুরু করলো জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এটা যে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বাড়িটা যত কাছে দেখা যায়, যাওয়ার সময় বোঝা যাচ্ছে বাড়িটা বেশ দূরে।
এক সময় তারা উপস্থিত হল ঠিক বাড়ির সামনে। ওয়াসিম নেওয়াজ কে বলল, Ôদেখ নেওয়াজ, কোন আদিম যুগের দরজা! এই দরজা দেখে তো আমার মনে হচ্ছে হাত দিয়ে কেবল একটা টোকা দিলেই মাথার উপর ভেঙ্গে পড়বে। এরমধ্যে আর যাই থাকুক মানুষ নিশ্চয়ই থাকবে না। কি বলিস নেওয়াজ?Õ
নেওয়াজ বলল, Ôতোর কথা সত্যি হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। যদি এমন হয় যে, যারা এইসব ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা হয়তো জেনেশুনে দরজার এই হাল করে রেখেছে। যাতে কারো সন্দেহ না হয় যে এই বাড়িতে কেউ আছে।Õ
মিরাজ বলল, Ôযাই বলিস না কেন নেওয়াজ, যদি এই বাড়িতে কেউ থেকেও থাকে, তাহলে আমি নিশ্চিত, এই দরজা দিয়ে কেউ আসা-যাওয়া করে না।Õ
আমিন বললো, Ôএমনও তো হতে পারে যেকোন গোপন দরজা আছে কত আমলের পুরনো বাড়ি এটা গোপন রাস্তা তো থাকতেই পারে।Õ
নেওয়াজ বলল, Ôসে ক্ষেত্রে আমাদেরকে গোপন দরজা খুঁজে বের করতে হবে।Õ
মিরাজ বলল, Ôওই দেখ নেওয়াজ একটা কুয়া দেখতে পাচ্ছি। আমি তো এমন অনেক রহস্য উপন্যাস পড়েছি যেখানে কুয়া দিয়ে ঘরে ঢোকার রাস্তা বানানো হয়। যদি........ Õ
সবাই সন্দেহের চোখে খানিকক্ষণ কুয়াটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর নেওয়াজ মিরাজকে উদ্দেশ্য করে বলল, Ôনাইস ট্রাই মিরাজ। কিন্তু
আনফরচুনেটলি এইখানে তোর সন্দেহ সঠিক নাও হতে পারে। কারণ কুয়ার আশেপাশে যেমন জঙ্গল আর কুয়ার গায়ে যে হারে শেওলার আস্তরন লেগে আছে, তাতে আমার মনে হয় না এই কুয়া দিয়ে কেউ যাতায়াত করে।Õ
মিরাজ হাফ ছেড়ে
দেওয়ার মতো একটা ভঙ্গিমা করে।
নেওয়াজ বলতে
থাকে, Ôআমার কথা মন দিয়ে শোন সবাই। এই বাড়ির আশেপাশে অনেক জঙ্গল। সুতরাং কেউ যদি এই বাড়িতে যাতায়াত করে, তাহলে তার যাওয়ার পথ অবশ্যই অন্যান্য জায়গার চেয়ে পরিষ্কার হবে। সুতরাং সবাই আশেপাশে ঘুরে দেখ। একটু পরিষ্কার দেখলেই আমাকে জানাবি, ঠিক আছে?Õ
সবাই খুঁজতে লাগলো। সময় গড়িয়ে যাচ্ছিলো দ্রূত। এদিকে আমিন কিছু করার বদলে একটা গাছের দিকে তাকিয়ে আছে, আর মুখে বলছে, Ôআরে বাপরে! এত বড় গাছ! এই গাছে কি কোনো মানুষ চড়তে পারে।Õ
কথাটা মিরাজের কানে গেল। সে আমিনের দিকে হাস্যসুলভ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, Ôহা হা হা, এই গাছ! আরে এই গাছে আমি তো আমার বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুল ঠেকিয়েই উঠে যাব!! গোটা
হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরার দরকারই পড়বে না।Õ
ওয়াসিম ন্যাকা ন্যাকা কণ্ঠে বলল, Ôওরে আমার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন রে!! বেশি বাতেলা না ঝেড়ে পারলে চড়ে দেখা।Õ
মিরাজ রেগে গেছে। ওয়াসিম এর দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলল, Ôআমি পারবো না? আমি পারবো না? তবে দেখ।Õ এই বলে মিরাজ তরতর করে গাছে ওঠা শুরু করলো। আমিন আর ওয়াসিম নিচ থেকে ওকে বারণ করছে। কিন্তু কে শুনবে? মিরাজ একেবারে মগডালে চড়ে বসল। নেওয়াজ ততক্ষণে গাছের নিচে পৌঁছলো। তারপর চিত্কার দিতে লাগলো, ইউরেকা ইউরেকা!!
ওপর থেকে মিরাজ জিজ্ঞাসা করল, Ôকিরে নেওয়াজ, বান্দরের মত লাফাচ্ছিস কেন রে? পেছনে আগুন লাগল নাকি?Õ নেওয়াজ বলল, Ôআমার পেছনে আগুন লেগেছে কিনা জানিনা। কিন্তু এবার আমি তোদেরকে যা শোনাবো তাতে তোদের কি হবে সেটা বলতে পারছি না।Õ
ওয়াসিম অবাক হয়ে
বলে, Ôকী এমন খবর, নেওয়াজ, যা শুনলে আমরা চমকে যাব?
Ôশোন তবে, এই গাছটাই হচ্ছে শেঠ বাড়িতে ঢোকার একমাত্র পথ। এই গাছের ওই যে বড় ডালটা, দেখ, ছাদের উপর দিয়ে গেছে। ওইটা দিয়ে বাড়ির ছাদের নামা যাবে। সুতরাং এটা পরিষ্কার, এই বাড়িতে কেউ অবশ্যই যাতায়াত করে। যাতে কেউ জানতে না পারে তাই গাছ দিয়ে উঠানামা করে।Õ
Ôতার মানে শেঠ বাড়িতে কঙ্কাল রহস্য কোন দৈবিক ঘটনা নয়। এটা কারো দুষ্টুমি হবে হয়তো। তাই...... Õ
Ôদুষ্টুমি করার জন্য কেউ এভাবে মানুষকে ভয় দেখাবে না। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে, যার জন্য কেউ এ বাড়ি থেকে সবাইকে দূরে রাখতে চায়। কিন্তু কী সেই কারণ?Õ
মিরাজ বলল, Ôসেটা জানার জন্য বাড়ির ভেতরে যেতে হবে। তা তোরা কি গাছে উঠবি, নাকি ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে হাওয়া খাবি?Õ
এই প্রস্তাব
শুনেই আমিনের জবাব, Ôনা রে ভাই। আজকে আর যাব না, বাড়ি যাই।Õ
আমিনের কথায়
মিরাজ টিটকারি মারা শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু নেওয়াজের সেদিকে খেয়াল নেই। ও কেবল
চিন্তা করছে গাছে চড়বে কীভাবে? ছোটবেলায় এগাছে ওগাছে লাফালাফি করেছে অনেক। এখনো কি
পারবে?
Ôঐ, নেওয়াজ!! তোকে কী আর বলব ভেবে পাই না। গাছে ওঠার আগেও
তোকে ভাবতে হচ্ছে? কীরে নেওয়াজ!!!Õ মিরাজের এক ঝাড়িতে নেওয়াজ ভাবনার জগত থেকে
বাস্তবে ফিরে এলো।
গাছে ওঠা শুরু
হলো। মিরাজ চমৎকারভাবে উঠলো। নেওয়াজও পারল উঠতে, ওয়াসিমের সমস্যা হল। কিন্তু সেও উঠে গেল। ওরা ছাদে নামল। কিন্তু আমিন তখনও নিচে দাঁড়িয়ে আছে। সে গাছে উঠতে নারাজ। সবাই ওকে ডাকছে। কিন্তু সে কিছুতেই উঠবে না।
মিরাজ ওকে খেপিয়ে তুলল, Ôআমিন রে, তোর দ্বারা ওকাজ হবে না। তুই তো দুধের বাচ্চা। যা, যা, বাসায় ফিরে গিয়ে ললিপপ খা।Õ
কথাগুলো আমিনের গায়ের সূঁচের মতো বিঁধলেও ওর সাহসে কুলালো না। বলল, Ôযতই আমাকে পাম দিস না কেন, আমি উঠবো না বাবা।Õ
নেওয়াজ বলল, Ôআগে জানলে তোর জন্য একটা মই নিয়ে আসতাম। এখন সবাই একটু আশেপাশে খুঁজে দেখ। কোন মজবুত লম্বা দড়ি পাওয়া যায় নাকি। দড়ি পেলে গাছের সাথে বেঁধে আমিনের দিকে ঝুলিয়ে দেব। তাহলে ও দড়ি ধরে গাছের সাথে পা ফেলে ফেলে উঠতে পারবে।Õ
মিরাজ তার ব্যাগ
দেখিয়ে বলে, Ôএই শোন, আমার ব্যাগের মধ্যে দড়ি আছে। এমন শক্ত, মোটা আর লম্বা দড়ির যে বিগ শো বা জন সিনাও টেনে-হিঁচড়ে ছিড়তে পারবে না।Õ
এই কথা শুনে ওয়াসিম রেগে আগুন হয়ে মিরাজের পিঠে দমাদম কিল বসাতে আরম্ভ করলো। আর বলতে লাগলো, Ôতোর কাছে দড়ি ছিল? তোর কাছে দড়ি ছিল? তাহলে আগে কেন বের করলি না হতভাগা। তোর জন্য আজ আমার দুই হাজার টাকা দামের শার্টের দফারফা হয়ে গেল।Õ
নেওয়াজ গিয়ে দুজনকে ছাড়িয়ে দিল। তখন মিরাজ বলছে, Ôআরে চাপা মারা থামা। দেখাই যাচ্ছে এটা তোর দাদুর ছোটবেলার শার্ট!! আবার বড় বড় কথা।Õ
Ôতবে রে।Õ এই বলে ওয়াসিম যখনই মিরাজের দিকে তেড়ে আসছিল, নেওয়াজ আবার থামিয়ে দেয়। মিরাজের ব্যাগ থেকে দড়ি বের করে আমিনের দিকে ঝুলিয়ে দেয়। আমিন দড়ি ধরে ধরে চমৎকারভাবে উঠে আসে।
তারা সবাই চিলেকোঠার দিকে যাত্রা শুরু করলো। নেওয়াজের আন্দাজই ঠিক। এখান দিয়ে কেউ না কেউ চলাচল করে। কারণ ছাদে প্রচুর শেওলা। কিন্তু চিলেকোঠার দরজা পর্যন্ত মসৃণ একটা রাস্তা তৈরি হয়েছে। নেওয়াজ ঘড়ি দেখলো। বেলা ১১টা বেজেছে প্রায়। চিলেকোঠার দরজা খোলা। ওরা সবাই ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে অন্ধকারাচ্ছন্ন। দেয়ালের ফাঁকফোকর থেকে আলো আসছে হালকা হালকা। মাকড়সার জাল ছিড়তে ছিড়তে ওরা এগোতে লাগলো।
ওয়াসিম বলল, Ôখুব মশা কামড়েচ্ছে রে।Õ তখন মিরাজ বলল, Ôওয়াসিম, তোকে একটা পরামর্শ দিই শোন। আজ রাতে খাবারের পর স্যান্ডউইচ এর মধ্যে একটা কয়েল ঢুকিয়ে আস্তে আস্তে গিলে ফেলবি। তারপর দেখবি, যে মশা তোকে কামড়াবে, সেই মশাটাই আগে ওপরে চলে যাবে। আর যে-সে কোম্পানির কয়েল খাবি না, খাবি গুড নাইট পাওয়ার একটিভ কোম্পানির কয়েল, বুঝলি?Õ
ওয়াসিম নেওয়াজের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, Ôনেওয়াজ, এই ছোট ছোট মশার কামড় সহ্য হচ্ছিল। কিন্তু এই বড় মশার এত তীক্ষ্ণ শুল, সামলানোই যাচ্ছে না। এখনই গিয়ে গলা টিপে ধরি, রক্ত খাওয়ার স্বাদ মিটিয়ে দিই, এরকমটা ইচ্ছে হচ্ছে।Õ
মিরাজ রেগে ওঠে, Ôকী? তুই আমাকে মশা বললি? তোর খবর আছে!Õ
আমিন ফোঁড়ন দেয়, Ôখেলার খবর নাকি আন্তর্জাতিক খবর? আমরাও শুনবো।Õ
মিরাজ বলল, Ôদেশী খবর রে, দেশী খবর। খবরের হেডলাইন- ডব্লিউ ডব্লিউ ডব্লিউ এর চ্যাম্পিয়ন জন সিনা কে কিডন্যাপ করার অপরাধে আমিন নামের এক নির্বোধ শিশুর ফাঁসির আদেশ।Õ
ওয়াসিম হেসে
বলে, Ôদেশি খবরের নামে বিদেশী খবর চালিয়ে দিলি। তাও আবার অসম্ভব খবর!Õ
নেওয়াজ ঝাড়ি
মারে, Ôতোরা কি থামবি? ওই দেখ, সামনে একটা দরজা। ওদিকে যাওয়া যাক। চল, এগিয়ে গিয়ে দেখি ব্যাপারটা কী।Õ
ওরা সবাই দরজার দিকে এগোতে লাগল। দরজা খুলে দেখে নিচে সিড়ি। তারা সিড়ি দিয়ে নামার জন্য যেই না পা বাড়িয়েছে, অমনি আমিন একটা চিত্কার দিলো। আমিনের গায়ে পড়ে ছিল একটা মাকড়সা। তবে ওদের ভাগ্য ভালো, আমিনের চিৎকারে কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। কেউ তেড়ে আসলো না।
ওরা সবাই সিড়ি দিয়ে একেবারে
নিচে নেমে এলো। সিড়ির শেষমাথায় আরেকটা দরজা। বোধহয় বৈঠকখানা এটা। কান পেতে শুনলো
ভেতরে নিরবতা পালিত হচ্ছে। শুনশান পরিবেশ। ওরা ভেতরে প্রবেশ করল। ভেতরে গিয়ে দেখল, অনেকগুলো মেশিন। তারা কাগজ আর কালির গন্ধ পেল। গন্ধটা অনেকটা নতুন টাকার মতো। তারা এগিয়ে গিয়ে দেখল একটা ডাস্টবিন। ডাস্টবিনে অনেক দলাপাকানো কাগজ ছিল। একটা কাগজ তুলে নিয়ে সোজা করলো। দেখা গেল একটা অর্ধ ছাপা ১০ টাকার নোট। বঙ্গবন্ধুর ছবি আর বাকি একটু অংশ উঠেছে। আরেকটা কাগজ তুলে নিল। সেটা ১০০ টাকার নোট। তবে সেই একই অবস্থা। তারা মসজিদের মেঝের তারাটি ছাপা হয়েছে। কিন্তু মসজিদ নেই।
নেওয়াজ বলল, Ôদেখলি এখানে জাল টাকা বানানোর ব্যবসা চলছে। তবে অন্যায়কারীদের বুদ্ধি দেখে কিন্তু আমার মনে হচ্ছে না। কঙ্কালের পেছনের নোট, তাও আবার জাল নোট।Õ
ওয়াসিম বলে, Ôভালো কথা নেওয়াজ। আসার পর থেকে এখনও পর্যন্ত তো কোন কঙ্কাল দেখলাম না। কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।Õ
আমিনের ভীত
কণ্ঠে বলে ওঠে, Ôবলিস না রে, বলিস না। কথায় আছে, শয়তানের নাম নিলি আর শয়তান হাজির। এখন তুই যদি কঙ্কালের নাম নিস, তাহলে কঙ্কাল তাঁর চোদ্দপুরুষসহ হাজির হয়ে যেতে পারে।Õ
মিরাজ অমনি হঠাত
সাহসী হয়ে ওঠে যেন। বলে, Ôআসতে দে কঙ্কালকে, ঠ্যাং ভেঙে যদি ব্যাঙ না বানিয়েছে তাহলে।Õ
ওরা চারপাশে খুঁজতে লাগলো। অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল। বিকাল হতে চলল। আসরের আজান শোনা যাচ্ছে। নেওয়াজ সবাইকে চুপ করতে বলল। নেওয়াজের বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে এটা কোন একটি দলের কারসাজি। নকল নোট ছাপার জব্বর একটা বাড়ি পেয়েছে বটে। কঙ্কালের ধারে কাছেও কেউ আসে না। এমন ফায়দা কি কেউ ছাড়ে? সেদিনের মতন ওরা ফিরে এলো। আর বেশি কিছু দেখতে পায়নি, কিন্তু বুঝতে পারা গেল যে শেঠ বাড়িতে জাল টাকা ছাপার কারচুপি চলছে।
৩
পরের দিন সন্ধ্যার দিকে রওনা হলো। ওদের কেন জানিনা
মনে হয়েছে রাতে কিছু পাওয়া গেলেও যেতে পারে। আজ রাত পর্যন্ত দেখে যাবে।
পরিকল্পনা মতো বৈঠকখানায় ঢুকলো। আজকে সবাই গাছে চড়েছে
দড়ি ঝুলিয়ে। ছাদে নামার পর সকলকে আস্তে আস্তে চলতে বলল নেওয়াজ। ওর সন্দেহ আজ কিছু একটা পাওয়া যাবে। ওরা সবাই শেঠ বাড়িতে ঢুকে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে রইল। রাত ৯টা পর্যন্ত।
চারদিকে অন্ধকার।
হঠাৎ ওদের কানে এলো ছাদ থেকে একটা শব্দ। কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে। একজন কি? না, একজন নয়। বেশ কয়েকটা লোক। ওরা বৈঠকখানা ছেড়ে
সিড়ির সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। ছাদের দিক থেকে আলো দেখা যাচ্ছে।
মিরাজ চুপিসারে বলল, Ôওদের মারার জন্য আমার হাত চুলকাচ্ছে। আমি একটা কাজ করি
নাহয়। আমি একাই গিয়ে সব কয়টার বাটনা বেটে দিয়ে আসি। তোরা এখানে থাক। আর লুকিয়ে লুকিয়ে দেখ, এই মিরাজ কী কী করতে
পারে।Õ
অনেক বারণ করল ওরা, কিন্তু আটকে রাখা গেল না মিরাজকে। আমিন ওকে চেপে ধরতে গিয়ে খানিকটা শব্দ করে ফেলল। শব্দটা একটু জোরে ছিল। তবে, শয়তানরা মনে হয় শুনতে পায়নি। শুনতে পেলে হয়তো জোরে ছুটে আসত। কিন্তু ওদিক থেকে আসা আওয়াজে স্পষ্ট বোঝা যায়, ওদের হাঁটার গতি স্বাভাবিকই আছে।
মিরাজ আমিনের হাত ছাড়িয়ে ছাদে গেল। কিন্তু মিরাজ কি একলা ওদের সাথে পেরে উঠবে? ওদের
মনে অনিশ্চয়তা। তবুও মনে জোরে বলছে দেখা যাক কী হয়। দুই মিনিট, তিন মিনিট, পাঁচ মিনিট। সময় চলছে নিজের গতিতে। মিরাজের কোন খবর নেই।
ওয়াসিম বললো, Ôনিশ্চয়ই মিরাজের কোনো বিপদ হয়েছে আমিন। আমাদের আগেই মিরাজের সাথে যাওয়া উচিত ছিল। তুই আমাদের আটকে রাখলি নেওয়াজ। না, এটা ঠিক হলো না।Õ
Ôবোঝার চেষ্টা কর ওয়াসিম। মিরাজ যে পরিমাণে ফাইট করতে দক্ষ, আমরা তিনজন মিলেও তার তিন ভাগের এক ভাগও পারব না। মিরাজ যদি একাই ওদের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে তাহলে তো হয়েই গেল। আর যদি না পারে, তাহলে নিশ্চয়ই ওরা মিরাজকে ধরে ফেলবে। আর যদি ধরেও ফেলে তাহলে আমরা তো আছি। আমরা যে কোনভাবে ওকে উদ্ধার করতে পারব। কিন্তু আমরা যদি সবাই যেতাম, তাহলে আমরা আটক হয়ে যেতে পারতাম। তখন আমাদের বাঁচাতো কে?Õ
Ôতোর কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু এত দেরী তো মিরাজের হওয়ার কথা নয়। এবার আমাদের ব্যাপারটা দেখতে যাওয়া উচিত। মিরাজ বিজয়ী হতে পারেনি। পারলে এতক্ষণে চলে আসতো। নিশ্চয়ই আটকা পড়েছে।Õ
Ôচল তাহলে।Õ
ছাদের দিকে এগোতে লাগলো ওরা। কোনো ঘরের মধ্যে কোনো জিনিস চুরি করার জন্য চোর যেভাবে হাঁটে ঠিক সেইভাবে পা টিপে টিপে এগোতে লাগলো। ছাদে পৌঁছাতে অনেক অন্ধকার। হঠাৎ আমিন কিছু একটা বেঁধে পড়ে গেল। চিৎকার দিল ওমা বলে।
আমিনের চিৎকারে কাছাকাছি এক গাছে থাকা কিছু বাদুর পাখা ঝাপড়াতে লাগল। ওয়াসিম তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে টর্চ বের করল। টর্চ দিয়ে আলো ফেলল আমিনের ওপর। দেখা গেল আমিন পড়ে আছে মিরাজের ওপর। আমিন উঠে পড়ল। কিন্তু মিরাজের জ্ঞান নেই। নেওয়াজ ওয়াসিমকে ব্যাগ থেকে পানি বের করে মিরাজের মুখে ছেটাতে বলল। ওয়াসিম তাই করল।
মিরাজের জ্ঞান ফিরে এসেছে। সে তখন ওয়াসিমকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, Ôহায় রে!! পানি ছেটাতে হয় আলতো করে। আর তুই এমন ভাবে আমার মুখে পানি মারছিলি যে পানি আমার নাক দিয়ে ঢুকে পেটে চলে গেছে। তোকে তো আজ আমি......।Õ
মিরাজ চুপ হয়ে গেলো। ওয়াসিম চটে গিয়েছে। বলছে, Ôকী করবি? বল কী করবি? মারবি আমাকে? তো আয়। হাত-পা আমারও আছে। আমাকে মারতে এলে আমি কি বসে থাকবো ভেবেছিস?Õ
মিরাজ যেন মুর্তি হয়ে গেছে। নেওয়াজ বলল, Ôকী হলো তোর?Õ মিরাজ কিছু না বলে শুধু সামনের দিকে আঙ্গুল প্রসারিত করলো। ওরা সবাই সামনে তাকালো। কিন্তু যা দেখলো, তা দেখার মতো মানসিক প্রস্তুতি কারো ছিলো না।
আস্ত একটা হাড্ডিসার দেহ। গায়ে মাংস-চামড়া কিছুই
নেই। কেবল আছে হাড়। সাদা সাদা। চিকচিক করছে। যেন ঝলক দিচ্ছে। এই জিনিসটাকে কঙ্কাল
ছাড়া আর কী বলা যায়?
ভয় পেয়ে ওয়াসিম আর আমিন গিয়ে নেওয়াজের পেছনে লুকোলো। মিরাজ আবার অজ্ঞান হয়ে গেছে। নেওয়াজের চোখের পলক পড়ে না। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে কঙ্কালটির দিকে। কঙ্কালের চোখের জায়গায় তো কিছুই নেই, ফাঁকা। তাই বোঝা না গেলেও বোধহয় কঙ্কালটাও নেওয়াজের দিকেই তাকিয়ে আছে।
কঙ্কালটি কথা বলতে শুরু করলো, Ôকিঁ রেঁ? তোঁরা কাঁরা? এঁখানে কীঁ মঁতলবে এঁসেছিস? ভাঁলো চাঁস তোঁ এঁখান থেঁকে পাঁলা। নাঁহলে কিঁন্তু আঁমি তোঁদেরকে ছাঁড়বো নাঁ। হিঁ, হিঁ, হিঁ।Õ
নেওয়াজ ভেবে ফেলল, তাদের এখন এখান থেকে পালাতে হবে। কঙ্কালের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে। সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। এখন কোনো প্রতিউত্তর করলে বিপদ তাদের। নেওয়াজ ওয়াসিমের ব্যাগ থেকে আরেকটা টর্চ বের করলো। তারপর আলো ফেলল কঙ্কালের ওপর। আলো ফেলতেই কঙ্কাল গায়েব। এই সুযোগে ওরা পালালো। সরে পড়লো মিরাজকে নিয়ে।
নেওয়াজ গাছ দিয়ে নামা সময় টর্চ অন্যদিকে ঘুরে যায়। তখন সে দেখতে পেয়েছিলো যে, কঙ্কাল যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো, ঠিক সেইভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। ওরা যে কীভাবে সাইকেল চেপে বাড়ি পৌঁছলো, তা অব্যক্ত।
৪
ভুত বলে কিছু নেই। যা আছে তা কেবল চোখের ভুল।
এই শিক্ষা ছোটবেলা থেকে মা-বাবার কাছ থেকে পেয়ে আসছে নেওয়াজ। এযাবৎ পর্যন্ত
কোনো ভুত দেখেও নি সে। তাই এবার প্রথম বারের মতো ভুত দেখে সে খানিকটা বিচলিত। যদিও
তার ধারণা যে ভুত বলে কিছু হয় না। তাহলে কালকে যেটা দেখলো, সেটা কী?
যখনই কখনো এভাবে ভাবতে ভাবতে আটকে গেছে, তখনই নেওয়াজ ক্লাবে গেছে। সেটাই করবে ঠিক করলো।
পরদিন সকালের জন্য অপেক্ষা করবে না সে। তখনি ফোন লাগালো সবাইকে। আসতে বলল ক্লাবে।
নিজেও গেলো চলে। উপস্থিত হলো ক্লাবে।
মিরাজ প্রথমেই নেওয়াজকে কথা শোনাতে শুরু করে, Ôভুত দেখে তোর কান্ডজ্ঞান কোথায় বেড়াতে গেছে রে? এটা দেখা করার কোনো সময় হলো।Õ
নেওয়াজের সটান উত্তর, Ôভুত বলে কিছু হয় না।Õ
আমিন প্রতিবাদ করে বলে, Ôতাহলে কাল যেটা দেখলি, সেটা কী ছিলো? বল কী ছিলো।Õ
ওয়াসিম নেওয়াজকে সমর্থন করল। বলল, Ôঅন্যকিছু হবে হয়তো।Õ
এবার নেওয়াজ তার বক্তব্য শুরু করে। ভুত বলে যে
কিছু হয় না, তার পেছনকার বৈজ্ঞানিক যুক্তি দেখায়। আবার সে বলে যে ভুত আছে, তবে এ
ভুত সে ভুত নয়। ভুতের সংজ্ঞা আলাদা। আর যা-ই হোক, জাল টাকা ছাপানোর বিষয় লুকোনোর
জন্য সত্যিকার ভুতের কোনো হাত থাকতে পারে না।
মিরাজ বলে, Ôতার মানে তুই বিশ্বাস করিস যে ভুত আছে।Õ
নেওয়াজ বলল, Ôহ্যাঁ, আমি বিশ্বাস করি যে ভুত আছে। আমি সেই ভুতকেই বিশ্বাস করি, যে ভুতকে
বিশ্বাস না করে উপায় নেই। কিন্তু আমি সেই ভুতকে বিশ্বাস করি না, যেটাকে বিশ্বাস
করার কোনো কারণ নেই, অর্থাৎ, সেই ভুত, যাকে তুই বিশ্বাস করিস।Õ
আমিন একটু চিৎকার দিয়েই বলে, Ôএমনিতেই ভুত নিয়ে মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে, এর মধ্যে তুই আবার এত
পেঁচিয়ে দিচ্ছিস যে...... Õ
নেওয়াজ ওকে থামিয়ে দেয়। বলে, Ôঐ কথাটা এমনি বললাম, ওটা নিয়ে চিন্তা করিস না। আমার মন
বলছে, এটা মানুষের কারসাজি। আসল ভুত তো আছে, ঠিক, কিন্তু কাল যেটা দেখলাম সেটা আসল
নয়। হতে পারে না।Õ
মিরাজ জানতে চায়, Ôতাহলে কি?Õ
নেওয়াজ উত্তর দেয়, Ôশোন, আমরা ভয় পেয়েছি।
মাথার মধ্যে গেঁথে বসে আছে যে ওটা ভুতই ছিলো। তাই অন্যকিছু ভাবতেই পারছি না। একটু
চিন্তা কর, দেখ, অন্যকিছু মাথায়
অবশ্যই আসবে।Õ
আমিন বলে ওঠে, Ôআমি জানি না তুই কোন ভুতের কথা বলছিস। ওটা আসল ভুত ছিলো, কারণ ওটা কথা বলেছে।Õ
ওয়াসিম যুক্তি বেঁধে দেয়, Ôযদি পাশ থেকে কোনো মানুষ কথা বলে, তো!Õ
নেওয়াজ কথাটা সমর্থন করে বলে, Ôঅবশ্যই পাশ থেকে কেউ কথা বলেছে, নেকো সুরে বলেছে। আর আমাদের মনে হয়েছে যেন কঙ্কাল কথা বলল। আমি তো এর
রহস্য বের করেই ছাড়বো। আর হ্যাঁ,
আমিন, তোর কাছে প্রশ্ন।Õ
আমিন বলল, Ôকী প্রশ্ন?Õ
নেওয়াজ বলল, Ôকালকে মিরাজ ছাদে উঠেছিলো
কেন? কয়েকজন লোকের পায়ের শব্দ পেয়েছিলো, তাই তো? তাহলে মিরাজ অবশ্যই ওদের, মানে কোনো
লোকদেরকেই মারতে গিয়েছিলো?Õ
মিরাজ বলল, Ôকিন্তু আমি ছাদে কোনো লোকের দেখা পাইনি।Õ
ওয়াসিম বলে, Ôকিন্তু শব্দ শুনে তো মনেই হলো যে কমপক্ষে চারজন লোক ছাদে হেঁটে বেড়াচ্ছে। ঠিক
কি না?Õ
আমিন বলল, Ôভুত চাইলে যেকোনো কিছু করতে পারে। শুধু চারজন কেন, চার হাজার লোকের পায়ের
আওয়াজও তৈরি করতে পারে।Õ
নেওয়াজ সশব্দে বলে ওঠে, Ôগেলেই তা দেখতেই পাবি।Õ
ওয়াসিম জিজ্ঞেস করে, Ôকালকে আবার যাবি নাকি?Õ
নেওয়াজ না বলে দেয়। কারণ সে চায় ওরা যেই বা
যারাই হোক না কেন, নিশ্চিন্তে ওদের গোপনে জাল টাকা বানানোর কাজ আবার শুরু করুক। ওদের ভাবতে দেওয়া উচিত যে নেওয়াজরা ভয় পেয়ে গেছে।
৫
দিন কয়েক পর আবার ওরা সবাই ক্লাবে গেল।
ওরা সবাই যেতে রাজি হয়েছে। নেওয়াজ আর ওয়াসিম
রাজি ছিলো। মিরাজ যখন যেতে না করে, তখন ওয়াসিম তার সাহস নিয়ে টিটকারি মারে। তাতে
মিরাজ খেপে যায় এবং নিজেকে সাহসী ও বাহাদুর প্রমাণ করতে সে যেতে রাজী হয়। কেবল
বেঁকে বসেছিলো আমিন। তবে মিরাজের এক ঝাড়িতে সে আর টু শব্দ করে না বলার চেষ্টা
করেনি।
এবার তারা রহস্যের জাল ছিড়বেই। আজ রাতেই শেষ করবে
মিশন কঙ্কাল।
সন্ধ্যে সাতটার মধ্যে ওরা শেঠবাড়িতে পৌঁছে গেলো।
চুপিচুপি ছাদে উঠলো। এবার এমন একটা মই এনেছিল, যেটাকে কাজ হয়ে যাওয়ার পর সাইজে ছোট বানিয়ে দিব্যি
ব্যাগে নিয়ে ঘোরা যায়।
ছাদের ওপর নামলো ওরা। পা টিপে টিপে চিলেকোঠার দিকে এগিয়ে
চলল। চিলেকোঠার দরজার সামনে যেতে না যেতেই শুনতে পেলো লোকজনের কোলাহল, আর টাকা
ছাপার মেশিনের শব্দ।
এ তো মেঘ না চাইতেই পানি।
আজ বোধহয় চৌদ্দগুষ্টি ভেতরে রয়েছে।
এতদিনে ইনস্পেকটর সাহেব সুস্থ হয়ে গেছেন। ডিউটি শুরু করে
দিয়েছেন। তাই ওঁকে একটা ফোন করার পরামর্শ দেয় ওয়াসিম। কিন্তু নেওয়াজ জানে
ইনস্পেকটর এখানে আসতেই চাইবেন না। আর এখানে এলেও, এদের ধরতে কোনোরকম সাহায্য করতে
পারবেন না। তাঁর দৌড় নেওয়াজের জানা আছে।
আজকে এইসব টাকার কারিগরগুলোকে হাতেনাতে ধরা যাবে। কিন্তু খালি হাতে নিরস্ত্রভাবে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো বোকামি হবে। তাই তাদের
প্রথম কাজটা আগে সেরে নিতে হবে, সেটা হলো অস্ত্র-কিডন্যাপ।
এই অস্ত্র-কিডন্যাপটা নেওয়াজরা বেশ ভালোভাবে আয়ত্ত করেছে।
এর আগেরবার যখন এক ব্যাংক ডাকাতকে ধরতে গিয়েছিলো, তখনো এই কাজ করেছে তারা। সফলও
হয়েছিলো।
শত্রদেরকে তাদের নিজেদের অস্ত্র দিয়েই পরাজিত করতে হবে।
প্রথমে আগে শত্রুদের কাছে থেকে তাদের সব অস্ত্র যেভাবেই হোক ছিনিয়ে নেবে। তারপর
সেই অস্ত্র দিয়েই তাদের প্রতিহত করবে। এই সহজ ব্যাপারের নাম দিয়েছে ওরা অস্ত্র-কিডন্যাপ।
যেহেতু নেওয়াজদেরকে এখনো কোনো-প্রকার অস্ত্র ব্যাবহার করার লাইসেন্স দেওয়া হয়নি,
তাই তারা শত্রুদের অস্ত্র দিয়েই শত্রুদের মোকাবেলা করে।
চিলেকোঠায় কেউ ছিলো না। ওরা চিলেকোঠায় প্রবেশ করলো।
চিলেকোঠার খিড়কি দরজা খুলে ফেলল। আজকেও আলো আসছে। নিচ থেকে।
কিন্তু ওদিনের তুলনায় বেশি তীব্র। ওরা সিড়ি বেয়ে নামতে লাগলো।
দরজার কাছে পৌঁছে গেছে ওরা। দরজার ফাঁকফোকরে চোখ রাখার
দারুন জায়গা। ওরা ওদিক দিয়ে দেখতে লাগলো ভেতরের দৃশ্য। সবাই দাঁড়িয়েছে গোল হয়ে।
১৪/১৫ জন হবে। ওরা যেভাবে ঘিরে রেখেছে, তাতে মাঝখানে কী আছে, তা দেখা যাচ্ছিলো না।
এদের সবার হাতে পিস্তল। সেগুলো আগে সরাতে হবে। পরিকল্পনা করে ফেলল। চারা হিসেবে
মিরাজকে ব্যবহার করা হবে।
মিরাজ তৈরি হচ্ছিলো। ওর হাতে একটা রুমাল। সেখানে লাগানো আছে
অজ্ঞান করার ওষুধ, ক্লোরোফর্ম। সে এগিয়ে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লো। আর বাকিরা শব্দ করে
সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠলো। যেন ওদের মনে হয়, দরজায় কড়া নেড়ে কেউ সিড়ি বেয়ে ওপরে চলে
গেছে।
কড়া নাড়ার পরেই মিরাজ সিড়ির নিচে লুকিয়ে দরজার দিকে লক্ষ্য
রাখতে লাগলো। দরজা খুলে গেলো। একটা পিস্তলধারী লোক, বাইরে বের হয়ে এলো। বাইরে বের
হয়ে খানিকক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে ছাদে ওঠা শুরু করলো। যেই না, সিড়ির দুই-ধাপ উঠেছে,
অমনি মিরাজ নিচ থেকে রেলিং ধরে লাফিয়ে ওঠে লোকটার ঘাড়ে। চিৎকার করার আগেই মুখে
রুমাল চেপে ধরে অজ্ঞান করে দেয়।
একটা পিস্তল পাওয়া গেলো। এবার আরো দরকার। আগের নিয়মই আরো
দুইবার চালায়। ফলাফল একই রকম আসে। তিনটা লোক অজ্ঞান, তিনটা পিস্তল বাজেয়াপ্ত।
এর পরেরবার আর কড়া নাড়ার প্রয়োজন পড়ে না। আগের লোকগুলোকে
খুঁজতে বের হয়ে আসে, এবার একজন নয়, দুইজন একসাথে। দুইজনকে কাবু করাও মিরাজের পক্ষে
অসম্ভব নয়, কিন্তু রুমাল ছোট। একসাথে দুইটাকে অজ্ঞান করা যাবে না। মিরাজ লুকিয়ে
লুকিয়ে ওপরে ইশারা পাঠিয়ে দেয়।
দুই পিস্তলধারী সিড়িতে ওঠা শুরু করে। সেই মুহুর্তে ওপর থেকে
ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নেওয়াজ আর ওয়াসিম। ক্লোরোফর্ম গুঁজে দেয়। কিন্তু সেই
মুহুর্তে আরেকটা লোক দরজা খুলে বের হয়, একে সামাল দিতে এগিয়ে যায় মিরাজ। অজ্ঞান
করে ফেলে। কিন্তু একটু দেরী হয়ে যায়। অজ্ঞান করার আগেই লোকটা চিৎকার দিয়ে ফেলে
বাঁচাও বলে।
বাড়ির ভেতর সবকিছু থমথমে হয়ে। সবাই চুপচাপ। ওয়াসিমের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। মিরাজের মাথায়
রক্ত চড়ে গেছে। নেওয়াজ মাথা
ঠান্ডা রেখেছে। সে ওদের বোঝালো। কারণ সে এখন ঝামেলা করে নিজেদের অবস্থান জানান
দিতে চায়না।
খানিকক্ষণ নিরবতা পালিত হলো। কোনো শব্দ আসছে না।
ছয়টা লোকের বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। একটা পিস্তল
ব্যাগে ঢুকিয়ে বাকি পাঁচটা চারজনে হাতে নিলো। মিরাজ একাই নিয়েছে দুইটা।
হামলার কোনো চিহ্নই নেই। যেন ভেতরের লোকজন কিছু
শুনতেই পায়নি। বাধ্য হয়ে ওরা ভেতরে ঢুকে পড়ল। এবার চারপাশে ঘিরে ধরা মানুষগুলোর সংখ্যা কমে
গেছে। তাতে মাঝখানটা পরিষ্কার দেখা যায়। ওরা দেখল বেশ কয়েকজন লোক মেশিনে টাকা
ছাপছে। আর সিংহাসনের মত চেয়ারে বসে আছে এক লোক। দেখে বোঝা যাচ্ছে এটা বস। চোখে সোনার চশমা, হাতে সোনার ঘড়ি। নেওয়াজরা নিজেদের লুকিয়ে
ফেলেছে। কিন্তু আমিন লুকানোর জায়গা না পেয়ে উসখুস করছিল। শেষে এমন
এক জায়গায় লুকিয়ে পড়লো, যেখানে অনায়াসে তাকে ধরে ফেলা যাবে। বস এদিকে আয়নায় মুখ
দেখছিল। আয়নার প্রতিফলনে আমিনের চশমা বসের নজরে পড়ে গেল।
বস বলে উঠলো, Ôকোয়ি ইধারপে হে, যো হামারা টিম কা নেহি হে। জাসুস জাসুস।
সাবলোগ এলার্ট হো যাও।Õ
নেওয়াজরা ভেবেছিলো ওরা অনেক আগেই বুঝে গেছে। কিন্তু
বসের কথায় তারা অবাক হয়ে গেলো। বস এতক্ষণে তাদের উপস্থিতি বুঝেছে?
সবাই সতর্ক হয়ে উঠতে লাগল। নেওয়াজরা খুব
ভালোভাবে নিজেদের গায়েব করেছে। সবাই তাদের খুঁজছে। শুধু আমিনকে পাওয়া গেলো। তাকে
ছাড়া আর কাউকে পাওয়া গেল না। আমিনকে ধরে বসের সামনে আনা
হলো।
বস বলে উঠলো, Ôএ বাচ্চে, ইধারপে কেয়া খেলনে আয়েহো?Õ
মিরাজ চুপিচুপি বলছে, Ôআমি হলে এতক্ষণে শিভার ডায়লগ দিয়ে দিতাম। বাচ্চা নাহি
ক্যাহনা আঙ্কেল। শিভা। শিভা নাম হে মেরা।Õ
ওয়াসিমের খেয়াল সেদিকে নেই। ও আর নেওয়াজ চিন্তায় আছে কীভাবে
আমিনকে উদ্ধার করা যায়।
কিছুক্ষণ পরে মোক্ষম একটা সুযোগ ওদের হাতের কাছে চলে এলো।
আমিনকে মাঝে রেখে লোকগুলো ঘিরে ধরেছে। নেওয়াজদের দিকে
পেছন ফিরে। নেওয়াজ ব্যাগের পিস্তলটাও হাতে নিলো। এবার ওরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। তারপর তিনজনে মিলে পাঁচজনের
মাথায় পিস্তল ঠেকালো। আর মুখে বলল, Ôযে যেখানে
দাঁড়িয়ে যাও না। হলে বুক ফুটো করে দেব।Õ
ওরা পিস্তলসমেত হাত উপরে তুলল। আর যাদের কাছে
পিস্তল আছে তারা সবাই পিস্তল তাক করলো। সকলের হাত কাঁপছে।
এবার গর্জে উঠলো মিরাজ। লাফ দিয়ে একজনের ঘাড়ের
ওপর চড়েছে। তারপর পিস্তল উপরের দিকে তুলে শুরু করলো গোলাগুলি। মাঝে মধ্যে এদিক-সেদিক
তাক করে ঘোড়া টিপতে লাগলো। এর ফলে যা হলো, তা অবাক করার মতো। যে পাঁচজন হাত
তুলেছিলো, ওরা লেজ গুটিয়ে পালালো। আর যারা পিস্তল তাক করে ছিলো, তারা পিস্তল সমেত
মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ভূমিকম্পের সময় লোকজন যেমন করে তেমনি। তবে খানিকক্ষণের মধ্যে
আবার উঠে দাঁড়ালো।
বস কিন্তু মোটেই ভয় করেনি। তার কাছে একটা পিস্তল
রয়ে গেছে। সেটা মুহূর্তেই বের করে আমিনকে কাছে টেনে নিল। তারপর আমিনের কপালে ঠেকিয়ে সবাইকে থামতে বলল। আমিন ভয়ে কাঁপছিল।
বসের হুংকার শুনে মিরাজ আর ওয়াসিমের কোনো বিকার
নেই। মিরাজ কয়েকটা লোককে ধরে কুস্তির মারপ্যাঁচ দিচ্ছে। আর ওয়াসিম ইতোমধ্যে
কয়েকজনের পায়ে গুলি করেছে।
বস আবার আকাশ কাঁপানো হুংকার ছাড়লো। নেওয়াজ
দেখলো বিপদ উপস্থিত। সবাই চুপ করে গেলো। বুঝলো, কিছু করার চেষ্টা করলেই বস আমিনের
মাথায় গুলি করে দেবে। একটুও দেরি হবে না।
খানিকক্ষণ নীরবতা।
মিরাজ আর ওয়াসিম একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলো। নীরব
হয়ে। বস সেদিকে যেই না তাকিয়েছে, সেই সুযোগে নেওয়াজ চুপি চুপি গিয়ে দাঁড়ালো বসের
পেছনে। তার আগে অবশ্য আমিনকে একটা ইঙ্গিত দিয়েছে যেটা আমিন বুঝতে পেরেছে। কিন্তু
বস বুঝতে পারেনি যে তার ওপর আক্রমণ হবে।
নেওয়াজ হঠাৎ বসের পেছন থেকে বের হয়ে হাসতে শুরু
করলো। সবাই অবাক। নেওয়াজ চিৎকার দিয়ে বলল, Ôআমি তোমাদের
বসের পেছনে একটা বোম ফিট করে দিয়েছি। এবার সবাই মরবে। হা হা হা।Õ
বস অবশ্য বুঝতে পারেনি নেওয়াজ কী বলছে। একজন লোক
বলে উঠলো, বসের পেছনে বোম!
বস পেছনে ঘুরে তাকিয়েছে। ঠিক সেই সুযোগে আমিন
একটা ঘুষি লাগালো সোজা বসের থুতনিতে। বস ককিয়ে উঠলো। তার হাতের পিস্তল পড়ে গেলো।
নেওয়াজ তৎক্ষণাৎ সেটা তুলে নিয়ে বসের কানে ঠেকিয়ে বলল, Ôএবার সবাই থেমে যাও। নাহলে বস খতম।Õ
প্রায় সবাই নিজের নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো। কেবল
একটা লোক, যেটাকে দেখেই একরোখা বলে মনে হয়, ঘুরে দাঁড়ালো। তার পিস্তল এখন নেওয়াজের
দিকে তাক করা। যেকোনো সময় ঘোড়া টিপে দেবে।
এটা ওয়াসিমের চোখে পড়লো। সে দ্রুত এগিয়ে গেলো
লোকটার পিছনে। লোকটার মাথার পিছনে পিস্তল ঠেকাবে বলে। কিন্তু যখনই সে লোকটার এক
হাতের মধ্যে এসে গেছে, অমনি লোকটা পিছনে ওয়াসিমের দিকে ঘুরে গেলো। তারপর প্রায় চোখ
বন্ধ করেই, চালিয়ে দিলো একটা গুলি......
শেষ কথা
গুলিটা ওয়াসিমের বাম হাতের কব্জিতে লেগেছে।
আঘাতপ্রাপ্ত হাতটা ডান হাতে জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে
ওয়াসিম। লোকটা ওয়াসিমকে গুলি মেরেই দৌড়েছে। দরজার দিকে। ওয়াসিম হাতের পিস্তল পড়ে
গিয়েছিলো। সেটা তুলে নিলো সে। তারপর বাম হাতে ধরেই লোকটার দিকে লক্ষ্য করে ঘোড়া
টিপে দিলো। গুলিটা গিয়ে লাগলো লোকটার গোড়ালিতে। লোকটা শুয়ে পড়ে গোড়ালি ধরে কাতরাতে
থাকে।
বস-সহ গুলি থেকে অক্ষত প্রত্যেকটা লোকের হাতপা
ভালো করে বাধা হলো। এবার নেওয়াজ ফোন লাগালো তাদের ইনস্পেক্টরকে।
Ôআসসালামু আলাইকুম, স্যার। ভালো হয়েছেন।Õ
Ôওয়া আলাইকুম আসসালাম নেওয়াজ। এই তো ভালো হওয়ার পথে। আজ আবার
ডিউটি জয়েন করলাম।Õ
Ôশেঠবাড়িতে চলে আসুন।Õ
Ôনা, না। কি বলছ? ওখানে, আমি যাবো? না, নেভার।Õ
Ôআরে আসুন না। আমরা আপনার ভুতের ব্যান্ড বাজিয়ে দিয়েছি।Õ
কয়েকজন সেপাইকে নিয়ে ইনস্পেক্টর হাজির হলেন
শেঠবাড়িতে। তারপর বাকি কাজগুলো সারা হলো। নেওয়াজদের অনুরোধে ইনস্পেক্টর সাহেব
সমস্ত ক্রেডিট নিজে নিলেন। এর ফলে নেওয়াজদের নাম কারো সামনে আসলো না। তবে তাদের এই
ঋণ অনেকখানি শোধ করলেন ইনস্পেক্টর, ওয়াসিমের চিকিৎসা বাবদ সকল খরচ নিজে মিটিয়ে।
ওয়াসিম এখন অনেকটা সুস্থ। তার সুস্থ হওয়ার
উপলক্ষ্যেই হোক, আর রহস্য সমাধানের উপলক্ষ্যেই হোক, ক্লাবে একটা ছোটখাট পার্টির
আয়োজন করা হলো। যেখানে সদস্য ছিলো সকল সেপাইসহ ইনস্পেক্টর শিরোপা খান, সাথে এই চার
জিনিয়াস- নেওয়াজ, ওয়াসিম, আমিন আর মিরাজ।
রহস্যের সমাধান
নেওয়াজদের তদন্তে বের হয়ে এসেছে কঙ্কালের রহস্য।
ওটা আসলে কোনো কঙ্কাল-টঙ্কাল
না। ওটা ছিলো একটা প্রতিবিম্ব, যেটা এসেছে শত্রুদের এমন একটা প্রজেক্টর থেকে, যেটা
পর্দা ছাড়াই প্রতিবিম্ব বানাতে পারে। তাই নেওয়াজ যখন আলো ফেলল কঙ্কালের ওপর, তখন
টর্চের আলো আর প্রজেক্টরের প্রতিবিম্ব এক হয়ে সাদা হয়ে গেলো। ফলে নেওয়াজ কঙ্কালকে
অদৃশ্য হতে দেখলো। আর টর্চের আলো সরিয়ে নিতেই কঙ্কালের প্রতিবিম্ব আবার দৃশ্যমান
হলো। আর নেওয়াজদের আন্দাজ ঠিক। পাশে থেকে একটা লোক একটা যন্ত্রের সাহায্যে কথা
বলেছে কঙ্কালের মতো করে।
কাহিনী শেষ

