নতুন নতুন বিয়ে করেছে আমাদের আলীমদ্দী।
বিয়ের পর থেকেই বউকে যেন একেবারে বাড়িতে বেঁধে রেখেছে। আজ পাঁচটা মাস হয়ে গেলো, বউ
বাপের বাড়ির মুখ দেখেনি। স্বামীকে বললেই স্বামী ঝাড়া উত্তর দেয়, ‘আগে এই বাড়িতে সেটল
হও। তারপর বাপের বাড়ি গিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবো নি।’ বলা বাহুল্য, ছোটবেলায় পাঠশালায় আলীমদ্দী
যে কিছুসংখ্যক ইংরেজি শব্দ শিখেছিলো, তাদের মধ্যে settle অন্যতম।
আলীমদ্দী যতই কথা ঘোরাক,
বউ কিন্তু বুঝে গেছে। আসলে যৌতুকের টাকা এখনো ফুরোয় নি, তাই স্বামী বাবাজী ঠ্যাংয়ের
ওপর ঠ্যাং তুলে দিন কাটাচ্ছে। যেদিন টাকা সব ফুড়ুত হয়ে যাবে, সেদিন এই সেটলওয়ালার ফুটানি
সব বের হয়ে যাবে। তাকে না চাইতেও শ্বশুরবাড়ি যেতেই হবে। সেই আশাতেই বউ বসে রইলো। আর
স্বামীকে ভালো-ভালো খাবার-দাবার, পোষাক-পরিচ্ছদ কেনার জন্য উষ্কানি দিতে লাগলো, যেন
টাকা তাড়াতাড়ি ফুরোয়।
আলীমদ্দী বউয়ের চালাকি
ধরতে না পেরে মনের সুখে খরচ করা শুরু করলো। হাটের দিনের বোয়াল মাছটা, শুক্রবারের গরুর
মাংসটা, প্রতিবেশীর বাগানের বড় কুমড়োটা, এই দোকানের শাড়িটা, ঐ দোকানের লূঙ্গিটা ইত্যাদি
ইত্যাদি কোনোকিছুই আলীমদ্দীর বাড়ি ছেড়ে অন্য কোনো বাড়িতে গেলো না। যার জন্য দেখতে দেখতে
একদিন সেই শুভদিন চলে এলো, যেদিন আলীমদ্দী দেখলো যে তার ট্যাক ফাঁকা।
গম্ভীর মুখ নিয়ে বউয়ের
কাছে গিয়ে আলীমদ্দী সোজা প্রস্তাব ছাড়লো, ‘বহুদিন হয়া গেলো, তোমার আব্বা-আম্মার মুখ
দেখি না। চলো, একবার বেড়ায়া আসি।’
এ কথা শোনার জন্যই তো
বউ এতদিন বসে ছিলো। তাই যেই না আলীমদ্দীর কাছ থেকে প্রস্তাব পেলো, অমনি ঘরে দৌড়। আর
দেখতে দেখতে সেজেগুজে ঘর থেকে বের হওয়াও শেষ। যাওয়ার জন্য একেবারে তৈরি সে। এই দেখে
আলীমদ্দীর তো টাশকি খাওয়ার মতোন অবস্থা। অন্য কোথাও যেতে গেলে বউ অন্তত দু’ঘন্টা সাজতে
সাজতেই কাটিয়ে দেবে। আর আজকে দু মিনিটও লাগেনি। আলীমদ্দী এতটাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো
যে, তার আর সাজুগুজুর দরকার হলো না। একটা নতুন পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়েই বউকে নিয়ে চলল
শ্বশুর বাড়ি।
গরুর গাড়ির ছইয়ের ভেতরে
বউকে বসিয়ে আলীমদ্দী নিজে বসল গাড়োয়ানের কাছে। বউয়ের সাথে গালগপ্প করার শখ নেই এখন
তার। তার কেবল চিন্তা, কীভাবে একটু-আধটু টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়া যায়।
ওরা শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে গেলো।
শ্বশুরবাড়িতে আলীমদ্দীর
যত্নের অভাব হয় না। দুই শালা সবসময় পেছনে পড়ে আছে। সঙ্গ ছাড়তেই চাচ্ছে না। সবসময় আদেশের
অপেক্ষায় রয়েছে। একটা শালীও আছে, বছর পাঁচেক বয়স। ঐ যে সকালবেলা একবার আলীমদ্দীকে চা
দেবে, ঐ শেষ। তারপর আর কাছে ঘেষে না। সারাদিন বাড়ির আশেপাশে টো টো করে ঘুরে বেড়ায়।
তবে শালা দুইজনকে পেয়ে
আলীমদ্দীর হয়েছে ভালো। যখন যা খুশি আদেশ করা যাচ্ছে ওদেরকে, নিজের কিছু করতে হচ্ছে
না। এতে সে বেশ খুশি। এছাড়াও শ্বশুরবাড়িতে ভালোমন্দ খেয়ে খেয়ে পেটটাকেও ডাবর বানিয়ে
ফেলছে। আহা! এই তো জীবন! আলীমদ্দীর এখন আফসোস হয়, ‘ইশ! আগে কেন এলাম না? এতদিন দেরী
কেন করলাম?’
আলীমদ্দী আর শ্বশুরবাড়ি
ছেড়ে নড়ছে না। এত সুখের জীবন কীভাবে ছাড়া যায়? কাজ নাই, কাম নাই। এমনকি সকালে ঘুম থেকে
উঠে মেসওয়াক পর্যন্ত নাই। কেবল খাও, আরাম করো আর ঘুমাও।
শ্বশুরবাড়ির সকলে আলীমদ্দীকে
ভালোভাবেই সহ্য করছে। কেবল তার বউ বাদে। বাপের বাড়ি এসে বউয়ের তেজ গেছে বেড়ে। সবার
সামনে কিছু বলে না। কিন্তু একা পেলে আলীমদ্দীকে একেবারে চিবিয়ে খায়! আচ্ছা করে কথা
শোনায়! আলীমদ্দীর তার বউয়ের কথায় কোনো কান নেই। এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে, অন্য কান দিয়ে
বের করে দেয়।
এদিকে মেসওয়াক না করার
জন্য আলীমদ্দীর দাঁত দিনকে দিন হলুদ হচ্ছে। একদিন তার দাঁত দেখে এক শালা তো বলেই ফেলল,
‘এ দুলাভাই, আপনের দাঁত হলুদ হয়ে হইয়া গেছে। ওয়ান টু ওয়ান টু, দুলাভাইয়ের দাঁতে গু।’
তার সাথে তাল মিলিয়ে ছোট
শালা বলে উঠলো, ‘দুলাভাইয়ের দাঁতে গু, ওয়াক থু ওয়াক থু।’
আলীমদ্দী এদের কথাও গায়ে
মাখায় না। সটান বলে দিলো, ‘সোনা দিয়ে বাধানো দাঁত হে! তোরা কি এর মূল্য বুঝবি?’
দিন আরো কাটছে। আলীমদ্দীর
দাঁত এবার হলুদ থেকে লাল হতে শুরু করেছে। একদিন এতটাই লাল হলো যে, শালী তো চা দিতে
গিয়ে দাঁত দেখে প্রায় অজ্ঞান হয়েই গিয়েছিলো। ‘ও মা গো, দুলাভাইয়ের দাঁত দিয়া রক্ত পড়তাছে
গো।’ এই চিৎকার করতে করতে আলীমদ্দীর শাশুড়ির কাছে দৌড়। খানিকক্ষণের মধ্যে শাশুড়ি হাজির।
জামাইয়ের দাঁত দেখে তাঁর আর কিছু বুঝতে বাকি রইলো না।
সেইবার প্রথমবারের মতো
সে এলাকায় আখের আমদানি হয়েছে। এর আগে এই এলাকায় কেউ আখ চিনতো না। আলীমদ্দীর এলাকাতে
তা এখনও অপরিচিত। গ্রাম্য অঞ্চলে সাধারণত কেউ আখ বলতো না। ছেলে-বুড়োরা প্রায় সবাই আখ
কে ‘কুশাল’ নামেই ডাকতে শুরু করলো। আর বেশি বুদ্ধিমানেরা বলতে লাগলো ‘চিকন বাঁশ’। এমন
বাঁশ যার ভেতরে ফাঁকা নেই, পুরোটাই রসে ভর্তি। আর প্রথমবারের মতো হওয়ায় কুশালের ছোবড়া
ছিলতেও বেগ পেতে হচ্ছিল। যারা ছিলতে পারছিলো, তাদের রীতিমতো ‘শক্ত দাঁতের পুরুষ’ হিসেবে
বিবেচনা করা হতে লাগলো। আর ধাঁধা? সেটা বের হতেও বেশি দিন লাগলো না।
আল্লাহর কী কুদরত!
লাঠির ভেতর শরবত!
এসব খবর শাশুড়ির কাছে
অনেক আসতো। জামাই বাবাজিকে তিনি এখন যদি মেসওয়াক করতে বাধ্য করেন, তাহলে জামাইয়ের মান-সম্মানে
লাগতে পারে। তাই তিনি এমন একটা কিছু করতে চাইলেন, যেন জামাই জানতেও না পারে, আবার দাঁতও
যেন ঝকঝকে হয়ে যায়। আর এতে যে আখের চেয়ে ভালো উপায় আর নেই, শাশুড়ি তা জানতেন।
কোনো ভুমিকা না করেই তিনি
জামাইয়ের কাছে গেলেন, শাড়ির আঁচল থেকে টাকা বের করে জামাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিলেন। তারপর
বললেন, ‘যাও বাবা। এই টাকা নিয়া গিয়া একখান কুশাল খাইয়া আইসো। দেখবা, খাসা জিনিস!’
এদিকে কুশাল যে কী জিনিস
তা তো আলীমদ্দী জানে না। কিন্তু শাশুড়ির কাছে এ কথা বলে কীভাবে? বললে মান থাকছে না।
তাই শাশুড়ির কাছে ব্যাপারটা গোপন রাখলো।
সোজা চলে গেল কুশাল কিনতে। কিন্তু, একে তো বেশ
মোটা হয়ে গেছে, তারপর আবার বেজায় গরম। আলীমদ্দীন হাঁটা-চলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালো। চোখ
বুজে আসতে চাইছে। পা আর চলছে না। এমন সময় সামনেই দেখতে পেল একটা দোকান। দোকানে দোকানদার
ছাড়া আর কেউ ছিলোনা। আলীমদ্দী দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চিতে গিয়ে বসে পড়লো। যে-ই না
বসে পড়েছে, অমনি ফুরফুর করে বাতাস লাগতে লাগলো। অথচ এতক্ষণ হেঁটে আসছিল, কিন্তু গাছের
একটা পাতাও নড়ছিলো না।
আলীমদ্দীর বেশ আরাম লাগছিলো।
ওখান থেকে আর উঠতে চাইছিলো না। তাই খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে দোকানদারকেই জিজ্ঞাসা করলো,
‘এ ভাই, কুশাল কী জিনিস? আশেপাশে কুশাল পাবো কই?’ জিজ্ঞাসা করার সময় মুখের এমন ভাব
করে রেখেছিল, তাতে যে কেউ দেখলে বুঝবে যে, ওর মত বোকা আর দুনিয়ায় কেউ নাই। বুদ্ধিমান
দোকানদারের সেটি বুঝতে বাকি রইল না।
এক অজানা কারণে এই দোকানদারটি
মোটা লোকজদের দুচক্ষে দেখতে পারে না। দেখলেই তেড়ে ওঠে। তার মনে প্রশ্ন, ‘মানুষ এত খায়
কেন? এত খেলে কী হয়? মোটা দেহ নিয়ে চলাফেরা করে কীভাবে? কেন করে? কেন, কম খেয়ে বাঁচা
যায় না। যতসব এসেছে রিজিক ধ্বংস করতে!’ তাই তার
ইচ্ছা হল এ লোকটাকে জব্দ করবে।
আরো একটা জিনিস খেয়াল
করলো দোকানদার। এই লোকটা এসে বেঞ্চিতে বসে অবধি, একটা খদ্দেরও দোকানে আসেনি! কী দুর্ভাগ্য!
এমন আট-কপালে মানুষ আসে কোত্থেকে? একে তো জব্দ করতেই হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে জব্দ করা
যায়? দোকানদার ভাবতে লাগলো। আর ভাবতে ভাবতে উপায় পেয়েও গেলো।
তার দোকানে পড়ে আছে দু-বছরের
পুরনো মেয়াদোত্তীর্ণ বিস্কুট। এই মোটুকে সেগুলো গছিয়ে দিলেই তো কেল্লা ফতে! তাহলে দোকান
থেকেও আবর্জনা বিদায় হবে, আর এ ব্যাটাকেও শায়েস্তা করা হবে!
বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে দোকানদার বলল, ‘কুশাল তো কাল পর্যন্ত আছিলো ভায়া। আজকেই শেষ হইয়া গেছে। তবে চিন্তা
নাই। আমার কাছে কুশালের রস দিয়ে বানানো বিস্কুট আছে। ওতে কামড় দেওয়া, আর কুশালে কামড়
দেওয়া সমান কথা। বুজতেই পারবেন না!’
কী আর করা? আলীমদ্দীর
আর ঘোরাঘুরি করে কুশাল খোঁজার ইচ্ছা নেই। তাই পুরো টাকা দিয়ে ওই বছর দুয়েকের পুরনো
বিস্কুটের বয়াম বগলদাবা করে বাড়িতে চলল।
এদিকে বেঞ্চি থেকে ওঠার
সময় বেঞ্চির কয়েকটা বাঁশের বাতা মটমট করে ভেঙে গেছে। দোকানদার কিছু বলে সাহস পেলো না। আলীমদ্দী
যাওয়ার পর আপন মনেই বিড়বিড় করতে লাগলো, ‘এই ব্যাটা কি আমার চালাকি ধরতে পাইরা শোধ নিয়া
গেল নাকি?’
এদিকে শ্বশুর বাড়ি পৌঁছানোর
আগেই বয়ামের অর্ধেক খালি করে ফেলেছে আলীমদ্দী। সদর দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই শাশুড়ির
মুখোমুখি হলো সে। শাশুড়ি জিজ্ঞেস করলেন যে সে কুশাল খেয়েছে কিনা। উত্তরে আলীমদ্দী নিজের মাথা নাড়িয়ে
হ্যাঁ বলল। তারপর একটু হাসি দেওয়ার জন্য নিজের তেত্রিস পাটি বের করতেই, দাঁত দেখে শাশুড়ি
মায়ের মুখ অনুভুতিহীন হয়ে গেলো।
আগে তো লাল ছিলই, এখন
আবার ময়দাওয়ালা বিস্কুটের প্রলেপ পড়ে তার অবস্থা আরও উন্নত হয়ে গেছে! শাশুড়ি অজ্ঞান!
তারপর পানি-টানি ঢেলে শাশুড়িকে চাঙ্গা করা হলো। এ ঘটনার পর আলীমদ্দীর বউ যে কী পরিমাণ নির্যাতন করে স্বামীর দাঁত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনল, সে ইতিহাস না বলাই ভালো।
ঘটনাটা ঘটার পর আরও কয়েক
দিন কেটে গেল। এতদিনে আলীমদ্দীন বউ আগের মতো নির্যাতন করে করে স্বামীর দাঁতে নিমের
দাঁতন ঘষিয়েছে। ফলাফলে, আলীমদ্দীন দাঁতগুলো এখন অন্ধকারেও ঝিলিক মারে।
দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে।
তবে আলীমদ্দী শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে নড়ছে না। একদিন সকালে সবাই মিলে খেতে বসেছে। সকলে গোগ্রাসে
খাচ্ছে। কেবল আলীমদ্দীর শ্বশুর ঠিকমতো খাচ্ছেন না। উদাস হয়ে ভাতের মধ্যে নকশা আঁকছেন
আর কী যেন ভাবছেন! এই দৃশ্য আলীমদ্দীর চোখে পড়ামাত্র সে শ্বশুর কে জিজ্ঞাসা করলো, ‘কী
আঁকান আব্বা? পৃত্থিবীর মানচিত্র নাকি?’
কথাটা শুনে শ্বশুরমশাই
চটে গেলেও মুখে কিছু বললেন না। আলীমদ্দীর বউ বাপের চটে যাওয়া ঠিকই বুঝতে পারলো। সামাল
দেওয়ার জন্য বলল, ‘বাজান, খাওয়া রাইখা কী ভাবেন? কোনো সমস্যা নাকি?’
‘সমস্যা কি আর ছোট, বেটি!’
শ্বশুর মশাই উত্তর করলেন। ‘জমির ধান সব পাইকা গেছে। ধান কাটা লোকদের আগেই খবর দিয়া
রাখছিলাম। আজকেই কাটতে আসার কথা। কিন্তু সকাল-সকাল খবর পাইলাম, ওদের একজনের নাকি পেটে
মোচড় দিছে! সেই যে সকালে পায়খানায় ঢুকিছে, আর বার হওয়ার নামই নেয় নাই। তাই ওই একটাকে
রাইখা বাকিরা আসতেছে। কিন্তু একজন বাদ থাকলে কি চলে? কওতো বেটি!’
আলীমদ্দীর বউ জবাব দিল,
‘এইডা কোনো কথা কইলেন বাজান? কেবল একজন আইবো না, তাতে সমস্যা কী? আপনের জামাই তো আছেই।’
বউয়ের প্রস্তাব শুনে আলীমদ্দী
বিষম খেয়ে উঠলো। বউয়ের মুখের দিকে তাকালো করুণভাবে! উত্তরে বউ তার দিকে এমন কটমট করে
তাকালো যার অর্থ এই হয় যে, ‘রাজি যদি না হও, তাহলে তোমার ভুঁড়ি বৃদ্ধি আমি বের করছি।
সকাল-সন্ধ্যা কেবল গান্ডে-পিন্ডে গেলা তাই না?’
বউ পাল্টি খেয়েছে দেখে
আলীমদ্দী এবার শ্বশুরের দিকে চাইল। ওর শুকনো মুখের ভাব দেখে ওর মনের কথা পড়ে ফেলা যায়।
ও বলতে চাইছিল, ‘আব্বা গো! ছেড়ে দেন আব্বা! এই কাঠফাটা রোদের মধ্যে আমি মাঠে যাব না
আব্বা! আব্বা! ও আব্বা! আমার পেটের মধ্যেও মোচড় দিচ্ছে গো আব্বা!’
কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো
না। শ্বশুর হয়তো এটাই চাইছিলেন। মেয়ে বলামাত্রই তিনি খাওয়া শেষ করে ফেললেন। তারপর নতুন
ধার করে আনা কাস্তে বের করলেন। সেটা জামাই বাবাজীর হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘দেখো বাবা।
ধান কাটো আর যা-ই কাটো, সাবধান, নাক যেন কাইটো না।’
কথাটার মাথামুণ্ডু না বুঝলেও আলীমদ্দী বাধ্য ছেলের
মত মাঠে চলল।
কাস্তে হাতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও
রোদ বাঁচিয়ে গাছের ছায়ায় ছায়ায় চলছে সে। আসার সময় শ্বশুর যে কথাটা বললেন, সেটা এখনো
তার মাথায় ঘুরছে। তার শ্বশুর কথাটা কেন বললেন? এটা সে ভেবে পেলো না।
ভাবতে-ভাবতে এমন এক সময়
এলো, যখন আলীমদ্দী উত্তর না পেলে আর বাঁচে না। শ্বশুর মশাই কীজন্য বললেন কথাটা?
ধান কাটার সময় নাক কীভাবে কাটতে পারে? উত্তর খোঁজার জন্য সে এইবার দূরত্ব মেপে দেখতে
লাগলো। একবার কাস্তে দেখে, আবার নাক দেখে। এমন করতে করতে একসময় সে কাস্তে দিয়ে নাক
ছুঁতে লাগলো, আর মুখে বলতে লাগল,
এই হলো নাক
আর এই হলো কাস্তে
এই হলো না আর
এই হলো কাস্তে
আর বলতে বলতেই ঘ্যাচাং!
আলীমদ্দীন নাকের উপরের
দিকে সোজা চিড়ে গেছে! কাস্তে ওখানে ফেলে নাক চেপে ধরে সে শ্বশুরবাড়ির দিকে ছুট লাগালো।
বাড়ি পৌঁছে ওর ঘটনা দেখার
পর কেউ আর না হেসে বাঁচে না। সবাই হাসছিল। শ্বশুর অতি কষ্টে হাসি চেপে রেখে জামাইকে
বললেন, ‘জানতাম, তুমি ঠিক এইডাই করবে। তাই সাবধান করে দিলাম। তারপরেও…….হা
হা হা।’
শেষমেষ বউয়ের যত্নে ভালো
হলো আলীমদ্দী। ভালো হওয়ার পরপরেই বউকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। এবার চিন্তা করেছে আর বোকামী
করবে না, চালাক হবে। আলসেমি করবে না, পরিশ্রম করবে। তার সিদ্ধান্তে বউও খুশি।
আর শ্বশুরবাড়ি?
আলীমদ্দীকে আর খুব সহজে ওমুখো হতে দেখা যায়নি!

